রিয়াজ উদ্দিন আকাশঃ
রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের দুর্গম নারানগিরি সিতা পাহাড়—প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে বঞ্চনার এক কঠিন বাস্তবতা। উপজেলা সদর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে হলেও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে আধুনিক সভ্যতার ন্যূনতম সুবিধা থেকেও বঞ্চিত শতাধিক মারমা পরিবারের বসতি এই এলাকায়। নেই যানবাহন চলাচলের রাস্তা, নেই নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা, আর শিক্ষার অবস্থা তো একেবারেই নাজুক। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েই এখানকার মানুষের উপজেলা সদরে যাতায়াত করতে হয়।
কোমলমতি শিশুদের পক্ষে প্রতিদিন এত দীর্ঘ ও দুর্গম পথ অতিক্রম করে বিদ্যালয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। অধিকাংশ পরিবার কৃষিনির্ভর ও অস্বচ্ছল হওয়ায় সন্তানদের শিক্ষার চেয়ে জীবিকা নির্বাহই হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রধান অগ্রাধিকার। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালে ‘সংগ্রাম’ নামের একটি এনজিও এই এলাকায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। জেলা পরিষদের সহায়তায় শিক্ষকদের বেতন প্রদান করা হতো। দীর্ঘদিন সেটিই ছিল শিশুদের একমাত্র শিক্ষালয়। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর আগে রহস্যজনকভাবে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে সেই বেড়ার তৈরি স্কুলঘরটি ভগ্ন ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পরিত্যক্ত পড়ে আছে। বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেলেও থেমে নেই শিক্ষার প্রয়াস। এলাকার দুই শিক্ষিত তরুণ—অংসাচিং মারমা ও সাইনুচিং মারমা—নিজেদের উদ্যোগে সেই জীর্ণ ঘরেই শিশুদের পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। কোনো বেতন বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছাড়াই কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অশিক্ষার অন্ধকার থেকে বাঁচাতে তাদের এই আত্মত্যাগ। তাদের ভাষায়, “প্রাথমিক শিক্ষা ছাড়া আমাদের জনপদের উন্নতির কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা সংকটের পাশাপাশি বড় দুর্ভোগ বিশুদ্ধ পানির অভাব। শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক ছড়া শুকিয়ে গেলে দেখা দেয় তীব্র পানির সংকট। বর্ষায় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঘোলা পানিই তখন পান করতে বাধ্য হন এলাকাবাসী। ফলে ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বয়স্করা। এলাকার কার্বারি পাইচিংমং মারমা, স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি ক্যথোয়াই অং মারমা এবং স্থানীয় ব্যক্তি শের খান ক্ষোভ ও আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে। ১৯৯৫ সালের সেই স্বপ্ন আজ ধ্বংসস্তূপ। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই—এখানে একটি স্থায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হোক। এ বিষয়ে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন বলেন, তিনি একাধিকবার এলাকা পরিদর্শনের চেষ্টা করলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, ডলুছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে সিতা পাহাড়ের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার এবং যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে জেলা শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। পাহাড়ের এই জনপদ কি অন্ধকারেই ডুবে থাকবে, নাকি প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপে সিতা পাহাড়ে আবারও জ্বলে উঠবে শিক্ষার আলো—এই প্রত্যাশায় দিন গুনছে এলাকাবাসী।
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃশামছুল আলম, প্রকাশকঃ রবিউল হোসেন রিপন, ০১৬৩৯২২৫২০৫, সম্পাদকঃ পম্পি বড়ুয়া
Copyright © 2026 দৈনিক রাঙামাটি সময়. All rights reserved.