নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটি
তীব্র তাপপ্রবাহ, কাপ্তাই হ্রদের পানির অস্বাভাবিক নিম্নস্তর, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের হ্রাস, দফায় দফায় লোডশেডিং এবং তিন মাসের মাছ ধরা নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে এক কঠিন সময় পার করছে পার্বত্য জেলা রাঙামাটির কাপ্তাই অঞ্চল। প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক—তিন দিক থেকেই প্রভাব পড়ায় স্থানীয় জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। পর্যটননির্ভর এই জনপদে এখন দর্শনার্থী প্রায় নেই বললেই চলে।
আবহাওয়ার এই বিরূপ অবস্থার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। সংস্থাটি বলছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো রাঙামাটি এলাকাতেও মাঝারি থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বিরাজ করছে। দিনে তাপমাত্রা বেশি থাকায় রাতেও স্বস্তি মিলছে না। অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে গেলেও সরবরাহে দেখা দিয়েছে বড় ঘাটতি।
এর প্রধান কারণ কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তর দ্রুত নেমে যাওয়া। পানির অভাবে দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র–এ উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। পাঁচটি ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে মাত্র একটি ইউনিট সীমিত সক্ষমতায় চালু রয়েছে, যা প্রায় ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে—স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম।
ফলে রাঙামাটি ও আশপাশের এলাকায় লোডশেডিং বেড়ে গেছে। দিনে-রাতে বারবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসায় ঘরোয়া জীবন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
পানির স্তর কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে নৌপরিবহনেও। কাপ্তাই হ্রদ–নির্ভর বহু খাল ও উপখাল প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফলে ছোট নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে, কৃষিপণ্য ও নিত্যপণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটোই বেড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিতে খাল খননের উদ্যোগ নেওয়ার চিন্তা করছেন, যাতে পানিপ্রবাহ কিছুটা সচল রাখা যায়।
এদিকে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন রক্ষা ও মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২৫ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে হ্রদে তিন মাসের মাছ ধরা, পরিবহন ও বিপণনে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও জেলে পরিবার ও মাছের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। নিবন্ধিত জেলেদের জন্য সরকারি খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত বলে জানিয়েছেন অনেকে।
সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব পড়েছে পর্যটনে। মনোরম প্রকৃতি, লেকভিত্তিক ভ্রমণ ও নৌবিহারের জন্য পরিচিত কাপ্তাইয়ে এখন পর্যটক উপস্থিতি খুবই কম। অতিরিক্ত গরম, লেকের পানি কমে যাওয়া, নৌচলাচলে বিঘ্ন এবং বিদ্যুৎ সংকট—সব মিলিয়ে ভ্রমণকারীদের আগ্রহ কমে গেছে। হোটেল-রিসোর্ট, নৌভাড়া, স্থানীয় দোকানপাট—সবখানেই ভাটা পড়েছে ব্যবসায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, “গরমে থাকা যায় না, বিদ্যুৎ থাকে না, লেকে পানি নেই—এ অবস্থায় পর্যটক আসবে কীভাবে?”
পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির জন্য তারা বৃষ্টিপাত ও মনসুনের অপেক্ষায় আছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, উল্লেখযোগ্য বৃষ্টি না হলে পানির স্তর স্বাভাবিক হবে না, আর পানির স্তর স্বাভাবিক না হলে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ানো সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে কাপ্তাই এখন এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখে—প্রকৃতি, বিদ্যুৎ, জীবিকা ও পর্যটন—চারটি খাত একসঙ্গে চাপের মধ্যে পড়েছে। মনসুন বৃষ্টি ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই স্থবিরতা কাটানো কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃশামছুল আলম, প্রকাশকঃ রবিউল হোসেন রিপন, ০১৬৩৯২২৫২০৫, সম্পাদকঃ পম্পি বড়ুয়া
Copyright © 2026 দৈনিক রাঙামাটি সময়. All rights reserved.