চৌধুরী মুহাম্মদ রিপনঃ
সুদূর লন্ডনে পিএইচডি সম্পন্ন করে চাইলেই বিলাসবহুল জীবন কাটাতে পারতেন তিনি। কিন্তু বিদেশের মোহ ত্যাগ করে নাড়ির টানে ফিরে এসেছেন নিজ জনপদে। লক্ষ্য একটাই—পাহাড়ের সুবিধাবঞ্চিত ও অনাথ শিশুদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসা। রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার দুর্গম কুকিমারা এলাকায় বৌদ্ধ ভিক্ষু ড. নাগাসেন মহাথেরোর একক প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা ‘লোটাস শিশু সদন’ আজ কয়েকশত শিশুর স্বপ্ন জয়ের কারখানায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সুইপ্রু কারবারি ও গংজ মারমার দান করা প্রায় ৫ একর পাহাড়ি জমির ওপর ২০১১ সালে ড. নাগাসেন বুনেছিলেন শিক্ষার বীজ। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে অনাথ ও পিছিয়ে পড়া শিশুদের মূলধারার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার এক অনন্য উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রাথমিক পর্যায়ে ৯৫ জন এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ২৯০ জনসহ মোট ৩৮৫ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০০ জন শিক্ষার্থী সম্পূর্ণ আবাসিক সুবিধায় থেকে পড়াশোনা করছে। লোটাস শিশু সদন কেবল একটি প্রথাগত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি শিশুদের জীবন গড়ার এক অনন্য পাঠশালা। প্রতিষ্ঠানটি তিনটি মূল লক্ষ্যকে সামনে রেখে পরিচালিত হচ্ছে—নৈতিকতা, দক্ষতা ও মানবতা। নৈতিকতা বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্র গঠন এবং অহিংসা ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করা। কর্তৃপক্ষের মতে, কেবল পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে ন্যায়-অন্যায় বোধ, সততা ও মানবিকতা গড়ে তোলা একটি সুস্থ সমাজ নির্মাণের পূর্বশর্ত। তাই লোটাস শিশু সদনে নৈতিক শিক্ষা ও তার বাস্তব প্রয়োগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের যুক্তিবোধ, কর্মদক্ষতা এবং সৃজনশীল উদ্যোগ গ্রহণের সক্ষমতা তৈরির ওপর জোর দিচ্ছে। ড. নাগাসেন মহাথেরোর মতে, প্রকৃত শিক্ষা তখনই সফল হয় যখন শিক্ষার্থীরা নিজস্ব চিন্তা, সাধনা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন করতে পারে এবং তা সমাজের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারে।
অন্যদিকে মানবতা বা মানবসেবাকে প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক সহানুভূতি, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলার মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যতে মানবকল্যাণে কাজ করার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ড. নাগাসেন মহাথেরো বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য শিশুদের কেবল অন্ন-বস্ত্র দেওয়া নয়, বরং তাদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। তারা যেন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে দেশের সুনাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, আমরা সেই স্বপ্নই দেখি। তিনি আরও বলেন, প্রকৃতিই মানুষের জীবনের মূল ভিত্তি। মাটি, আকাশ, বায়ু, পানি ও গাছপালা—সবই প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু উন্নয়নের নামে মানুষ ক্রমাগত প্রকৃতিকে ধ্বংস করছে, যা ভবিষ্যতে মানবসভ্যতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও সম্মিলিতভাবে কাজ করার মানসিকতা তৈরি করা। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে লোটাস শিশু সদনে প্রাথমিক শাখায় ৫ জন এবং মাধ্যমিক শাখায় ১৩ জন শিক্ষক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে বোর্ড থেকে পাঠদানের অনুমতিও পেয়েছে।
আবাসিক ৩০০ শিক্ষার্থীর জন্য রয়েছে সুশৃঙ্খল জীবনব্যবস্থা। প্রতিদিন সকাল ৯টা, বিকেল ৪টা এবং রাত ৯টায় ডাইনিং হলে তাদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশন করা হয়। ঘরহারা এসব শিশুর কাছে প্রতিষ্ঠানটি এখন এক নতুন পরিবারের মতো। তবে এত বড় মানবিক উদ্যোগ পরিচালনার পথে রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। প্রায় ৫ একর পাহাড়ি চত্বরে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট এখন বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ৩০০ জন আবাসিক শিক্ষার্থীর খাবার ও অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করতেও কর্তৃপক্ষকে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। বর্তমানে মূলত বেসরকারি অনুদানের ওপর নির্ভর করেই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ড. নাগাসেন মহাথেরো নিজের ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে অনাথ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তারা মনে করেন, যথাযথ সরকারি সহায়তা এবং সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে লোটাস শিশু সদন পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে।
প্রধান সম্পাদকঃ মোঃশামছুল আলম, প্রকাশকঃ রবিউল হোসেন রিপন, ০১৬৩৯২২৫২০৫, সম্পাদকঃ পম্পি বড়ুয়া
Copyright © 2026 দৈনিক রাঙামাটি সময়. All rights reserved.